আত্মঘাতী চাঁদের বুড়ি / পর্ব - ২

 


রাত পোহাল । কাক-পক্ষি নাই, তাই তাদের আওয়াজও নাই । খুবই স্বাভাবিক, তবু অস্বাভাবিক মনে হয় রমেনের । পৃথিবীর লোকেদের এই এক জটিল সমস্যা, নিজের অজানা সব কিছুকেই অস্বাভাবিক মনে করে, মনে করে আনন্দই পায় । হাত মুখ ধুঁয়ে খবরের কাগজ পড়তে বসল, কাগজ পড়া ওর অভ্যাসে নেই । তবু কাগজ ও রাখে, নিউজ বাদ দিয়ে কাগজটাও অনেক কাজের । বাজারে পুরনো খবরের কাগজ কিনতে গেলে নতুন কাগজের থেকে দাম বেশি পড়ে যায়, তাই নতুন খবরের কাগজই রাখে । আজ কাগজ খুলে পড়তেও বসল । উদ্দেশ্য চাঁদের বুড়ির সাথে ওর "রসায়ন" নিয়ে কি লেখা হয়েছে তা দেখা । সারা কাগজ বার কয়েক উলটে পালটেও এই বিষয়ে কোন খবর সে খোঁজে পেলনা, অবাক কাণ্ড ! ব্যাপারটা সে আগেই আন্দাজ করেছে, চাঁদে আসার পর থেকে ওর ওজন টা কমে গেছে, চাঁদের গ্র্যাভিটি কম বলে । কিন্তু এর পরিণাম যে এই হবে তা সে ভাবেনি । ওর এখন আর পৃথিবীর মানুষের মত নিউজ ভ্যালু নেই । অবশ্য এটা ভালই হল, কেউ কিছু জানতে পারলনা ।

 

আজ কিছু খেতে হবে । অনেকদিন কিছু খায়নি, ক্ষিধে বোধটা একদম মরে গেছে । ক্লান্তিও নেই । শরীর খেতে হবে কিনা তা বোঝতে পারছেনা, বুঝতে পারছে মস্তিষ্ক । এমনটাও হওয়ার কথা, বিশ্ব সময় সংস্থা সর্বজনীন সময় স্থাপনা করেছে, মানুষের জন্মের পর তার শারীরবৃত্তিয় ঘড়িতেও সেই সময় সেট করে দেয়া হয়, ক্ষিধে লাগার সময় হলে ক্ষিধে লাগবে । ঘুমানর সময় হলে ঘুম পাবে । আর সবার যেমন পাবে, রমেনেরও পাবার কথা । এমনটাই হয়ে আসছে । কিন্তু এখানে আসার পর থেকে কি যেন সমস্যা হয়েছে, সম্ভবত ওর বিচি না থাকায় এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে । হা ভাগ্য!

 

যাহোক, ওসব নিয়ে চিন্তা রমেন এখন করছেনা, রমেন ভাবছে চাঁদের বুড়ি কি আসলে ঈশ্বর ? রমেনের তাই যেন মনে হচ্ছে, চাঁদের বুড়িই সৃষ্টি করেছেন পৃথিবীর সব মানুষ, সব পশু, সব গাছ, সব পাখি । অথচ কেউ চাঁদের বুড়িকে কখনো ভুলেও ঈশ্বর ভাবেনি, সকলে ধরেই নিয়েছে ঈশ্বর পুরুষ । চাঁদের বুড়ি পুরুষ যদি পুরুষ হত, তাহলে হয়তবা কারো কারো মনে এ কথা আসতো । রমেন যেন বিশ্বাস করতেই চাইছে যে চাঁদের বুড়িই ঈশ্বর, চাঁদের বুড়ির ওই দাঁত মাজার ডাল, ওটা দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হয় সবকিছু, চাঁদের বুড়ির দাঁত মাজা বন্ধ হলে, বন্ধ হবে দুনিয়া, আর ঘুরবেনা পৃথিবী, জ্বলবেনা সূর্য । কে করে রে চাকরি আর, কাগজ কলম নিয়ে তখনই বসে পড়ল লিখতে, গবেষণা পত্র লিখে বাড়ি বাড়ি বিলি করবে । নাম-গন্ধ-টাকা সবই হবে । ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে তাঁর নাম, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক - দুটোই হবে রমেনের চিরকালীন পরিচয় ।

 

কিন্তু কোম্পানি যদি আবার দাবি করে এই গবেষণার দাবিদার ওরা, তাহলে তো ফেঁসে যাবে সে... কি করা যায় ? সে করলে করবে, দেশে আইন কানুন তো আছে । ইশ প্ল্যাটোর মত নিজের একটা একাডেমী করবে, দেশ বিদেশের লোক এসে তার কাছে চাঁদের বুড়ির কথা জেনে যাবে, নূতন একটা ধর্মের উদয় হওয়াও অসম্ভব নয় । অনেক কোম্পানি শুরু হবে, পয়সা খরচ করলেই নিয়ে যাওয়া হবে ঈশ্বরের কাছে । চাঁদের বুড়ি - তুমিই ঈশ্বর ।

 

Post a comment

0 Comments