Saturday, 11 April 2020

করোনা ও মানসিক স্বাস্থ্য

April 11, 2020 0 Comments

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত তথ্য অনুসারে প্রত্যেক বছর আট লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে আত্মহত্যার মাধ্যমে । যার অধিকাংশই উপযুক্ত চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে রোধ করা সম্ভবপর ছিল । প্রতি চল্লিশ সেকেন্ডে সে সকল মানুষ আত্মহত্যা করছেন তাদেরকেও বাঁচানো সম্ভব ।

শিশু ও তরুণদের যে সমস্ত কারণে মৃত্যু হয়ে থাকে তার মধ্যে দ্বিতীয় প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের আত্মঘাতী হওয়া । আর আত্মহত্যার মুখ্য কারণ হচ্ছে মানসিক অসুস্থতা ।
যে মারাত্মক মানসিক অসুস্থতাটি বেশি দেখা যায় সেটি হচ্ছে, ডিপ্রেশন । বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ২৭ কোটি মানুষ ডিপ্রেশনের শিকার । ২৭ কোটি মানুষ । ডিপ্রেশন ছোঁয়াচে নয় বলেই শুধু মহামারীর তকমা পায়নি হয়ত ।

ডিপ্রেশন যে একটা মারাত্মক ব্যাধি - এ বিষয়ে সচেতনতা রয়েছে আমাদের দেশের খুব কম সংখ্যক মানুষেরই । ডিপ্রেশন বলতে এরা বোঝেন মন খারাপ । এমনকি নামজাদা কবিরাও নিজের কবিতার পঙক্তিতে লেখেন, "ডিপ্রেশনের বাংলা জানি মনখারাপ" । আর এমন অনেকই আছেন যারা জানেন ডিপ্রেশন ঠিক কতটা মারাত্মক ও দুঃসহ, তবু বলেন, ওসব কিস্যু না । এটা করলে সেরে যাবে, ওটা করলেই সেরে যাবে । সত্যি বুঝিনা নিজের অনভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে এইসব টক্সিক কথা না ঝাড়লে যে কি এমন মহাভারত অসুদ্ধ হয় । এইকরম কথা যে অসুস্থতাটা আরও বাড়িয়ে দেয় সেটা এরা কিছুতেই বোঝেনা ।

মোট আত্মহত্যার ৭৬ % হয়ে থাকে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে । ভারতবর্ষ এর আদর্শ উদাহরণ । আমাদের দেশে এক লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষ প্রতি বছর আত্মহত্যা করেন, অর্থাৎ মোট সংখ্যার ১৭ শতাংশই ভারতে । এর একটা বড় অংশ সেইসব মহিলারা যারা পারিবারিক হিংসার শিকার । সেইসব কৃষকরাও আছেন যারা রাষ্ট্রের অবহেলার ফলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ।

কিন্তু এছাড়াও একটা বড় অংশের মানুষ রয়েছেন যারা নানান মানসিক ব্যাধিতে ভোগেন, অবশেষে শেষ পরিণতি হিসেবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন, কিন্তু চিকিৎসার পথে যান না । আসলে অনেকেই বুঝতে পারেননা যে তিনি কোন মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন । আর নিজে বুঝলেও কাছের মানুষদের অবহেলার কারণে সেই অসুস্থতা আর কোনদিনই সারে না । ফুরিয়ে যায় জীবন । উচ্চআয়ের দেশগুলোতে বেশি, ফলে আত্মহত্যার হার কম । তাছাড়া প্রাণঘাতী কীটনাশক নিষিদ্ধ করার ফলেও অনেকটা ফারাক এসেছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা ।

তাই আসুন এবার জেনে নিই ডিপ্রেশন নামের মানসিক ব্যাধিটির কিছু লক্ষণ ও প্রতিকার । তার করার আগে বলে রাখি, কারো ডিপ্রেশন কিনা তা ব্লগপোষ্ট পড়ে নির্ণয় করা সম্ভব নয় । নির্ণয় একমাত্র মেন্টাল হেলথ প্রফেশনালরাই করতে পারেন, উপযুক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে । বা আমি যা বলতে চলেছি সেগুলোই যে ডিপ্রেশনের একমাত্র লক্ষণ ও প্রতিকার তা একদমই নয় । শুধু একটা প্রাথমিক ধারনা হিসেবেই জানবেন । বাকিটা সাইকিয়াত্রিস্ট বা সাইকলজিস্টরাই বলতে পারেন ।

১। অবিরত দুঃখের অনুভূতি, দুশ্চিন্তা, সবকিছুই অর্থহীন মনে হওয়া ।

২। আশাহীন হয়ে যাওয়া । ডিপ্রেশন গ্রস্ত ব্যাক্তিরা কিছুতেই কোন আশা খুঁজে পাননা ।

৩। একটা অপরাধবোধ কাজ করে, নিজেকে মূল্যহীন অথবা অসহায় ভাবতে শুরু করেন ডিপ্রেশনের রোগীরা ।

৪। একসময় যা ভাল লাগতো তাও আর ভাল লাগেনা ।

৫। মনোযোগ কমে যায়, স্মৃতিশক্তিও । সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন ।

৬। ঘুম হয় কমে যাবে, নাহয় বেড়ে যাবে ।

৭। মেজাজ চিরচিরে হয়ে যায় ।

আট । সব থেকে মারাত্মক লক্ষণ হচ্ছে আত্মহত্যার ভাবনা মাথায় আসবে, আত্মনিধনের চেষ্টাও করতে পারেন ।

এগুলো হচ্ছে ডিপ্রেশন নামক দানবীয় অসুখের লক্ষণ । এবার প্রশ্ন হচ্ছে কেন হয় ? ডিপ্রেশনের একটা নির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয় । অনেকসময় অনেকগুলো কারণের জটিল সমন্বয়েও ডিপ্রেশন হয়ে থাকে ।
পরিজনদের সহায়তা ও সঠিক চিকিৎসাই ডিপ্রেশন থেকে রেহাই পাবার উপায় ।

আপনি যদি আপনার কাছের কোন মানুষের মধ্যে এরূপ আচরণ দেখেন, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের সাহায্য নেবেন । নিজে নিজে থেরাপি দেয়ার চেষ্টা করবেন না, কখনো বলবেন না, ও কিচ্ছু নয়, ডিপ্রেশন কোন রোগই নয়, এটা করলে সেরে যাবে, ওটা করলে সেরে যাবে... প্লিজ এরকম ওস্তাদি করার অর্থ হচ্ছে তাকে মৃত্যুর দিকে আরও একটু স্বেচ্ছায় ঠেলে দেয়া ।

করোনা মহামারী রুখতে ভারতবর্ষ ও সারা বিশ্ব জুড়েই যে লকডাউনের পথ বেছে নেয়া হয়েছে তার ফলে করোনাকে অনেকটা রুখা গেলেও অর্থনৈতিক মন্দা আসবেই । এমনিতেই ভারত বর্ষের অধিকাংশ মানুষের আয় দশ হাজারের কম, ফলে এই অর্থনৈতিক মন্দা জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে চলেছে । মানসিক অসুস্থদের আরও অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, হতে পারে করোনা সংক্রমণের চেয়ে করোনা কর্তৃক সৃষ্ট মানসিক চাপই অধিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে । জর্মনির হেশেঁ প্রদেশের অর্থমন্ত্রী টমাস শেফার গত ২৮ মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে আত্মহত্যা করেন করোনা সংক্রমণের ফলে হওয়া অর্থনৈতিক বিদ্ধস্ততার রূপ দেখে হতাশ হয়ে ।

অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা বছর পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে । ফলে মাতাপিতারা নিজের সন্তানদের পাশে থাকবেন । বিচলিত হতে দেবেননা । মানসিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা না করে আর দশটা অসুখের মতই প্রতিরোধ করুন ও অন্যদের করতে সাহায্য করুন ।

Thursday, 8 February 2018

জনবিস্ফোরণ

February 08, 2018 1 Comments
হেলেন বাবুর জন্মদিন আজ । চল্লিশটা বছর বেঁচে আছেন পৃথিবীর গায়, প্রত্যেক বছর আজকের দিনটাতে নিজের উপর বেশ গর্ববোধ করেন তিনি, গর্বেরই বিষয় বটে, পৃথিবীতে বেঁচে থাকা কি আর চাট্টিখানি কথা? কিন্তু, এ বারের জন্মদিনটা আর পাঁচটা জন্মদিনের মত নয়, আজ তিনি মরবেন বলে ঠিক করেছেন । নির্ধারিত বয়স যদিও পঞ্চাশ, কিন্তু দশ বছর আগেই বিদায় নেবেন বলে পরিকল্পনা করে রেখে ছিলেন বেশ ক-বছর আগে থেকেই । আজ সেই দিন চলে এসেছে । শহরের সকলেই উনার জন্যে গর্বিত । সকলের এত ভালবাসা দেখে অবাক হচ্ছেন খুব হেলেন, সত্যি, লাভ ছাড়া কেউ গর্বিত বোধ করেনা !

আরশি জগতে দেখা দিয়েছে জনবিস্ফোরণ, তাই মৃত্যু নিয়ন্র্কনে এগিয়ে এসেছে বহু রাষ্ট্র । ভি,আই,পি নামের কতক জীব ছাড়া পঞ্চাশ বছরের বেশি বেঁচে থাকার অধিকার নেই কারো । এ নিয়ে আন্দোলন কম হচ্ছেনা, মানুষ ক্ষুব্ধ খুব । গদি হারানোর চরম সম্ভাবনা রয়েছে শাসক দলের । হেলেনবাবু কখনো এক কলমও লেখেননি এসব নিয়ে, জীবন-মৃত্যু নিয়ে কোনও লেখাই তাঁর কলমে উঠে আসেনি কখনো । স্থানীয় একটা কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখি ছিল উনার সখ, গোটা দশেক বই লিখেছেন, পাণ্ডুলিপি তৈরি আরও দুটোর । এমনি করে ভালোই চলছিল হেলেন সাহেবের একার জীবন, হুট করেই যেন চলে এলো মৃত্যু দিনটা ।

সারাদিন ধরেই লোকজন আসা যাওয়া করছেন । অন্যদের মত কোনও জাঁকজমক চাননা মৃত্যুর অনুষ্ঠানে, বরং সেরে ফেলতে চান একান্ত ঘরোয়া ভাবেই । তবুও আসছেন লোকেরা উপহারের ডালি সঙ্গে নিয়ে । এই মাত্র বেড়িয়ে গেলেন দুই সহ-অধ্যাপক, দুজনেই খুব ভাল উপহার এনেছেন । উনারা না আনলে হেলেনবাবুর কখনো জানাই হতনা এভাবেও মরা যায় । একজন এনেছেন একটা সূচ । এই সূচ শরীরের যেকোনো কোথাও ১ সেমি প্রবেশ করালেই মৃত্যু নিশ্চিত, এমনকি গোড়ালিতেও । পছন্দ হয়েছে উনার খুব এটা । অপরজনেরটা আরও চমৎকার, একটা ডি,ভি,ডি, । ডি,ভি,ডি-তেই মৃত্যু ।

উপহারের স্তুপ নেহাত ছোট নয় । ডেথ টুলই অধিকাংশ । ডেথ টুল ছাড়া শুধু রয়েছে একটা মাত্র চকোলেট । পাশের ফ্লাটের লোকটার সাথে এসেছিল উনার ছ-বছরের মেয়েটি, বাবা দিলেন ডেথ টুল, দেখাদেখি মেয়ে দিল চকোলেট । ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বেশ একটু ধমকেও দিলেন পিতা কন্যাকে, “অসামাজিক, অসভ্য মেয়ে ! আজকের দিনে চকোলেট দিতে আছে?”

যখনই একা হচ্ছেন স্মৃতিতে ডুবে যাচ্ছেন যেন । কত কত স্মৃতি এই চল্লিশ বছরের । মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে বারবারই, খুব ইচ্ছে করছে মাকে জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদতে, একটু হাঁসতে, মা মা বলে ডাকতে । ভাবতে ভাবতে মনে পরে গেল সেই ছোট্ট বেলার কথা, যখন বিশ্বাস ছিল পৃথিবীর সব কিছু তিনি পারবেন । তখন মৃত্যুকে খুব ভয় করত তাঁর । মৃত্যু থেকে পালিয়ে বেড়াতেন কল্পনায় । যেমন করেই হোক, তিনি অমরত্বলাভ করবেনই । নিজেই একটা কিছু আবিষ্কার করবেন যা দিয়ে মৃত্যুকে এড়ানো যাবে, পৃথিবী ধংস হয়ার আগেই কিছু একটা করে চলে যাবেন অন্য একটা গ্রহে...ওসব কথা ভেবে বড় হাঁসি পাচ্ছে আজ । যে মানুষটা মৃত্যুকে এত ভয় করত সেই মানুষটাই আজ দশ বছর আয়ু রেখে মরতে যাচ্ছে !

জীবনটা আসলে বিষিয়ে উঠেছিল কেমন... কিছুই আর ভাল ছিলনা, কিছুই ভাল লাগতনা । একটা মানুষের মধ্যে দুটো মানুষ বেঁচে আছে বহুদিন । মা ছাড়া জীবনে কাউকে কখনো পাননি, অথচ মায়ের মৃত্যুর পর থেকে গতকাল পর্যন্ত মাকে খুব মনে পড়েছে এমন হয়নি । বরং কল্পনার স্ত্রী, কল্পনার প্রেমিকা, কল্পনার সন্তান, কল্পনার বন্ধু এদেরকেই মিস করতেন একেকসময় ।

অতিথি আসা বন্ধ হল রাত নটার দিকে । শেষদিকে বেশ হাঁপিয়ে উঠেছিলেন । হাঁসি মুখে কথা বলতে পারার একটা সীমা আছে সবারই, আর তাছাড়া আজকের দিনটা জীবনের শেষদিন, ইচ্ছা ছিল নিজেকে নিয়ে কাটাবেন – পারা গেলনা । আজ রাতেই মরতে হবে, ইচ্ছেটা কখন যেন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে । মরতেই হবে । আগামিকাল ভোর ভোর মেডিকেল কলেজ থেকে লোকেরা আসবে দেহটা নিয়ে যেতে, ওদের জন্যে হলেও মরতেই হবে । শেষবারের মত একটু ঘুমাতে ইচ্ছে হল । রাত এগারটার অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন তাই, এটাই তাঁর জীবনের অন্তিম সাধ ।

পরদিন সকাল ছটায় এসেই মেডিকেল কলেজের অ্যাম্বুলান্স উপস্থিত হল । দরজা সাধারণত ওরা ভাঙে, ভাঙতে ভাঙতে দরজা ভাঙাটাও একটা প্রথা এখন । কিন্তু দরজাটা ভাঙতে হলনা, খোলাই ছিল । মৃত্যুই যখন জীবনের উদ্দ্যেশ্য তখন এমন সুরক্ষার কথা ভাবা মূর্খতাই বটে ! কিন্তু লাশ বাহকরা অবাক হলেন যথেষ্টই এতে, কিন্তু তারও চেয়ে অধিক অবাক হলেন সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খোঁজেও কোনও মানুষের দেহ না পেয়ে । ‘ডেথ টুল’ গুলোর স্তুপ পড়ে আছে, লেখার টেবিলে খাতা, ল্যাপটপ, রেফ্রিজারেটরে খাদ্য, নেই শুধু সেই জন্মদিনের উপহার চকোলেট আর গতকালকের ‘ডেথ্‌ ডে বয়’ ।

Sunday, 15 October 2017

সন্তরন

October 15, 2017 6 Comments
হাতা ভাঙা কাঠের চেয়ারে বসে উঠোনে ঝরে পড়া কতকগুলো শিউলি ফুলের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল অঞ্জনা । অবশ্য ভাবার মত বেশি কিছু নেই, কেবল দুজনকেই ভাবে সে, আর কাউকে ভাবেনা এবং ভাবতে চায়ওনা । প্রথমজন অঞ্জনার মা, একটা বছর ধরে মায়ের চিন্তা লেগেই আছে ওর, কি যে হয়ে গেল মায়ের, কেনইবা হল এমন, মাকে ভাত খাইয়ে দিতে গিয়ে প্রায়ই চোখে জল আসে অঞ্জনার । গতবার পুজোয়ও মাকে নতুন শাড়ী পরিয়ে বলেছিল, "মা, তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে", কোথায় হারিয়ে গেল মায়ের সৌন্দর্য ? শুকিয়ে চিংড়ি মাছের মত হয়ে গেছেন, চুলগুলো জীর্ণ সুপারী গাছের ছইয়ের মত ! মা কেন পাগল হয়ে গেল ? ছি: ছি: পাগল নয়, নিখিল মানা করেছে পাগল বলতে, নিখিল বলেছে মানসিক অসুস্থ বলতে । নিখিল, নিখিলই হচ্ছে সেই দ্বিতীয়জন যাকে সে ভাবে । নিখিল ওর ক্লাসমেট, ভারী মিষ্টি ছেলেটা । নিখিলকে ভালোবাসে অঞ্জনা খুব । নিখিলও কি বাসে ? বলেছিলতো বাসে, খুব খুব ভালোবাসে । তাহলে আবার যে বলল ভালোবাসা একটা ফিলিং, সম্পর্ক নয় ! তাহলে কি বাসেনা ভালো ? না বাসলে এত করে ফোন করবে কেন ? এত মিষ্টি করে কথা বলবে কেন ? ওফ্ ! নিখিলের অনেক কথারই অর্থ বোঝে উঠতে পারেনা অঞ্জনা, পারুক না পারুক, নিখিলকে ভালোবাসে খুব । নিখিল ছাড়া কেইবা আছে ওর মন বোঝার ?
দুজনের মধ্যে কার কথা ভাবছিল কে জানে ? হয়তো অঞ্জনা নিজেও জানেনা, নিজের অজান্তেই ভেবে যাচ্ছিল ।...
হঠাৎ এক ফোটা চোখের জল নাক বেয়ে ঠোটে এসে লাগলো --- সে কি, ও যে কাঁদছে ! ...এমনি করে কত কান্না কেঁদে যায় রোজ, কত অশ্রু বয়ে যায় --- দেখার মত কেউ নেই, কোনো মানুষ নেই যে ওর চোখ মুছিয়ে দেবে, আছে কেবল একটা বিস্তির্ন নীল আকাশ, যা ওর সকল অশ্রু টেনে নিয়ে নিজের অশ্রু করে ঝড়িয়ে দেয় এই নিষ্ঠুর জগৎটার বুকেই । তখন সবাই দেখে কিন্তু জানতে পারেনা কেউই যে, এ অঞ্জনার চোখের জল । আর জানলেইবা কী হবে ? আজ ছয়টা দিন ধরে যে ওর পেটে এত ব্যথা, যেন কোনো ঘূণ পোকা ছিদ্র করে চলেছে ওর নাড়ি-ভুরিতে, সে কি জানেনা ওরা ? কতবারতো বলেছে, কই কেউতো নিয়ে যায়নি ডাক্তারের কাছে ! কই বলেনিতো বাবা ভুলেও একবার --- "মা, খুব ব্যথা হচ্ছে ? যা, শুয়ে পড়গে, সব ঠিক হয়ে যাবে ।..."  এই কয়টা দিন ধরে যে ওর শরীরে কয়েক ফোটা জল ছাড়া আর ঢোকেনি কিছুই সে কথা কি জানেনা ওরা ? কতবারতো ওদের সামনেই করেছে বমি, তবুও রাঁধতে হচ্ছে ওকেই, দিতে হচ্ছে ভাত বেড়ে, মাজতে হচ্ছে বাসন, এমনকি অফিসে যাওয়ার আগে ধোঁয়ার জন্য শার্ট ফেলে যেতেও ভুলেননা বাবা ! পরীক্ষাও ঘনাচ্ছে, একটু চিকিৎসা চায়, ভালোবাসা চায় --- এ চাওয়া কি খুব বেশি কিছু চাওয়া ?
যতই ভাবছে, কাঁদছে ততই, যেন ওর চারপাশের সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসছে, অন্ধকার ঠিক নয়, অন্ধকারের চেয়েও শূণ্য, আকাশ, শিউলি ফুলের গাছ, বাড়ি-ঘর, রোদ্র, উঠোন সবকিছু শূণ্য হয়ে আসছে !
হঠাৎ বেজে উঠলো মোবাইল ফোনটা, অচেনা নম্বর, হতে পারে যে কেউ, ক্ষণেকের মধ্যে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে ফোনটা ধরলো, ও, এযে নিখিল । সম্পূর্ণ স্বাভাবিক স্বরেই বলল এবার অঞ্জনা --- এতোদিন পর মনে পড়লো আমার কথা ?
  --- কেন, তুই কি ক্যাকটাস যে বার বার নাড়া দিয়ে উঠবে মনে কাটার ঘা লেগে ? ওসব ন্যাকামো ছেড়ে বল কি করছিস ?
  --- এইতো, বসে আছি ।
  --- প্রিপারেশান কেমন নিলি ?
  --- আমি পরীক্ষা নাও দিতে পারিরে...
  --- কেন ? তোর পেট খারাপ হলো নাকি !
  --- হাঁ রে, আজ ছ'দিন ধরে ভীষন ব্যাথা, যা খাই তা-ই বমি করি ।
  --- ডাক্তার কী বলল ?
  --- নারে, ডাক্তার দেখাইনি ।
  --- কেন ?
এবারে নিশ্চুপ থেকে গেল অঞ্জনা । নিখিলই বলল --- এসব কেন করিস বল ? যা তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে ।
  ---হুম
  ---তা রান্না-বান্না কে করছে ?
  --- আমিই, জানিসইতো মায়ের মেন্টাল প্রোবলেম, আর বাড়িতে মেয়ে মানুষ বলতে তো মার আর আমিই ।
  --- কেন, তোর না দুটো ভাই আছে?
  ---ধ্যেৎ, ছেলেরা কি আবার রাঁধে নাকি ?
  ---বাহ্ ! কি সুন্দর কথা !
  --- আমার ফিলিংসগুলো কেউ বোঝেনারে নিখিল ।
এটুকু বলতেই অঞ্জনার চোখ দিয়ে আবার শুরু হল জল পড়া, কিন্তু নিজের সম্পূর্ণ ক্ষমতা লাগিয়ে কণ্ঠস্বর এমন রাখলো যাতে নিখিল টের না পায় কিছু ।
  --- তোকে আর বলার মত কথা নেই আমার কাছে, ডাক্তার দেখা, সুস্থ হয়ে ওঠ ।
  ---হুম ।
  ---রাখছি ।
  ---রাখ ।
আর বাঁচতে চায়না অঞ্জনা, মরে যেতে চায়, কতদিন ধরে চেয়ে আসছে । চায়না আর এ যন্ত্রণাময় জীবন । মরে যাবার জন্য কত চেষ্টাই না করেছে সে, কখনো নিজেই নিজের হাতে টিপে ধরেছে গলা, কখনো কেটে দিয়েছে হাত । গলায় দড়ি দেওয়ারও চেষ্টা করেছিল একদিন, শাড়ি পাকিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে বিছানায় টুলও তুলে নিয়েছিল । কিন্তু টুলে চড়ে পাখার সাথে বাঁধতে যাবে শাড়িটি, ঠিক তখনই হঠাৎ ভেঙে পড়েছিল কান্নায়, কেমন এক অদ্ভুত রকমের ব্যথা অনুভব করলো । মনের কোনো এক গহিন অঞ্চল থেকে আসছিল সে ব্যথা, কিংবা হয়তো ব্যথা নয়, একটা আশা --- বাঁচার । এরই জন্যে মরতে পারেনি সেদিন, তা না হলে সেদিনই মরে যেতে পারতো । কি ভালো হত মরে যেতে পারলে --- আজ আর এতো দুঃখ, এতো এতো যন্ত্রণা সইতে হতোনা ।
খচ্ করে কেটে দিল হাত, চকচকে একটা ব্লেড দিয়ে । রক্ত ঝড়তে আরম্ভ করলো, কিন্তু কোনো ব্যথা যেন নেই, ব্যথা হয়না, এটা ওর অনেকদিনের অভ্যাস । মরে যাওয়ার এক চেষ্টা । মরতে পারেনি আজও, কিন্তু রক্তের লাল রঙ দেখে চোখের জল বর্ণহীনতার জন্য লজ্জা পায়, দুঃখ যেন লাঘব হয় ।
খচ্, খচ্, খচ্ : আবারো পুঁচ, একসাথে কয়েকটা । চোখ আর এই ক্ষতগুলো যেন কোনো ঘন সবুজ  নিভৃত পাহাড়ী অরণ্যের দুটো ঝর্ণা, নেমেছে প্রতিযোগীতায় । প্রতিযোগীতা টিকলোনা খুব বেশিক্ষণ, মনের ঝর্ণা, হৃদয়ের ঝর্ণার কাছে হার মেনে নিল । কিন্তু হায়, আজও হলনা মরে যাওয়া !
দুপুরটা কেটে গেল এভাবেই, সন্ধ্যায় রাঁধতে হল আবারো ওকেই । পেটে ব্যথা ছিল, সাথে এখন হাতেও । দেখায়না কাউকে, জামা পরেছে লম্বা হাতাওয়ালা । সবাইকে খাইয়ে যখন শুতে গেল অঞ্জনা, মেসেজ দেখলো নিখিলের, "কিরে, কী বলল ডাক্তার ?" মেসেজটা দেখা মাত্রই সারা মন জুড়ে কেমন এক ক্রোধের হাওয়া বইল --- সমস্ত শক্তি দিয়ে ছুঁড়ে ফেলল মোবাইল ।
তারপর কত রাত অব্দি যে প্রার্থনা করলো তার ঠিক নেই । " হে ঈশ্বর আমাকে নিয়ে যাও, আমি যেন আর না জাগি, নিয়ে যাও ঈশ্বর, নিয়ে যাও" ।
ঈশ্বর ডাক না শুনে নিজের অস্তিত্ব না থাকার প্রমাণ দিলেন প্রতিবারের মত আরো একবার । সকালে উঠে বাসন নিয়ে পুকুরে গেল, কিন্তু মাজলোনা সে, একটা একটা করে ব্যুমেরাং এর মত মাঝপুকুরে ছুঁড়তে লাগলো বাসন । আহা, কি আনন্দ, কি হাসি, জীবনে হাসেনি এমন করে আর কোনোদিন । কিন্তু বাসন শেষ হয়ে যেতেই শুরু হল কান্না, এ কান্না আর দশদিনের কান্না নয়, নীরবে-নির্জনের নয় । কান্না রীতিমত জোড়ালো, জগৎটাকে জানান দিয়ে  ।
এ লীলা থামেনি আর, এখনো সে কখনো কাঁদে, কখনো হাসে, হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে । কাঁদতে কাঁদতে মাথা আছড়ায় । হয়তো এ কান্না-হাসি কেবলই কান্না-হাসি নয় বরং মরে যাওয়ারই অভিনব এক প্রচেষ্টা । কিন্তু বাঁচতে দিক আর না-ই দিক, মরে যেতে ওকে দেবেনা কেউ, সেজন্যেই এখন ওর হাত-পা বেঁধে রেখে ওর জীবনটাকে ধরে রাখা হয়েছে ।

Follow Us @soratemplates